যাদের টবে সবজি চাষের শখ, তাদের কাছে লঙ্কা গাছের চাষ দারুণ আনন্দের। বলা ভাল, যে কেউ লঙ্কার চাষই আগে করেন। ছাদবাগানে লঙ্কার চাষ সহজ। তবে, কিছু সমস্যার কারণে তা দুশ্চিন্তা বাড়ায়। আর তার মধ্যে সবার আগে রয়েছে ফুল ঝরে যাওয়ার সমস্যা। গাছ লাগিয়ে ফুল এলে তাতে মুখে চওড়া হাসি ধরে অনেকেরই। কিন্তু সেই ফুল ঝরে গেলে হতাশ হতে হয়। ফুল ঝরে যাওয়া মানে লঙ্কা আর গাছে ধরবে না। তাই গাছের পিছনে সব খাটনিই বৃথা। লঙ্কা গাছে ফুল ঝরে যাওয়ার কারণ নিয়ে তাই অনেকেই দুশ্চিন্তায়।
অনেক সময় দেখা যায় লঙ্কা গাছ খুব সুন্দর সবুজ হয়ে বাড়ছে, কিন্তু ফুল আসার পরেই তা হলুদ হয়ে ঝরে পড়ে যাচ্ছে। ইউটিউব ভিডিও দেখে অনেক সমাধান হয়তো ট্রাই করেছেন, কিন্তু সঠিক পরিমাপ বা পদ্ধতি না জানার কারণে ফল পাননি। আজকের এই ব্লগে আমরা জানব লঙ্কা গাছে ফুল ঝরে যাওয়ার কারণ এবং ৩টি জাদুকরী সমাধান।
এক নজরে
লঙ্কা গাছে ফুল ঝরে যাওয়ার কারণ
লঙ্কা গাছের ফুল ঝরে যাওয়া আর পাতা কুঁকড়ে যাওয়া এই দুটি একেবারে সাধারণ সমস্যা। এর সমাধান জানার আগে সমস্যাটার মূল কারণ বোঝা জরুরি। লঙ্কা গাছের ফুল ঝরার প্রধান ৩টি কারণ হল:
১. বোরনের অভাব (Boron Deficiency): বোরন লঙ্কা গাছের জন্য সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ মাইক্রো-নিউট্রিয়েন্ট। এর অভাবে ফুলে পরাগায়ন হতে পারে না এবং তা ঝরে যায়। ফুলে পরাগায়ন প্রাকৃতিক পদ্ধতি, তা না হলে ফুল থেকে ফল হবে না। অকালেই ফুল ঝরে যাবে, সাধের গাছে আর লঙ্কা পাবেন না।
২. অনিয়মিত জল প্রয়োগ: মাটি অতিরিক্ত ভিজে থাকলে বা একদম শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলে গাছ ‘স্ট্রেস’ মোডে চলে যায়, ফুল ফেলে দিয়ে শক্তি সঞ্চয় করে গাছ।
৩. তাপমাত্রার পরিবর্তন: অতিরিক্ত গরম (৩৫° সেলসিয়াসের বেশি) বা আর্দ্রতার অভাব থাকলে পরাগায়ন বাধাগ্রস্ত হয়। তাপমাত্রার হেরফের হলে ফুল ঝরে যাবে।
এছাড়াও অনেক সময় রোগ-পোকার আক্রমণের কারণে লঙ্কা গাছের পাতা কুঁকড়ে যায় এবং ফুল ঝরে যায়। কীভাবে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাবেন? সাধের গাছে লঙ্কার ফলন বাড়াবেন কীভাবে?
লঙ্কা গাছে ফুল ঝরে যাওয়ার সমাধান
সমাধান ১: হিউমিক অ্যাসিড (Humic Acid) – শিকড় ও মাটির সঞ্জীবনী
সাধারণত লঙ্কা গাছের ফুল ঝরা বন্ধ করতে হিউমিক অ্যাসিড ম্যাজিকের মতো কাজ করে। শুধু লঙ্কা গাছ নয়, যে কোনও গাছের ক্ষেত্রে এই হিউমিক অ্যাসিড শিকড় ও মাটির সঞ্জীবনী। এটি কিন্তু কোনও সার নয়, বরং এটি মাটির পুষ্টি শোষণ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।এটি গাছের শিকড়কে অনেক গভীরে নিয়ে যায় এবং মাটির অণুজীবদের সক্রিয় করে। ফলে গাছ মাটি থেকে খাবার বেশি পায় এবং ফুল ধরে রাখার শক্তি পায়।
ব্যবহারের নিয়ম: ১ লিটার পরিষ্কার জলে ২-৩ গ্রাম বা ১ চামচ হিউমিক অ্যাসিড ভালো করে মিশিয়ে নিন।এই মিশ্রণটি সরাসরি গাছের গোড়ায় দিন। প্রতি ১৫ দিন অন্তর এটি ব্যবহার করলে আপনি এক মাসের মধ্যেই তফাত বুঝতে পারবেন।
সমাধান ২: NPK ১৯:১৯:১৯ – গাছের সুষম ডায়েট
গাছের ডালে যদি সঠিক পুষ্টি না থাকে, তবে সে ফুল ধরে রাখতে পারে না। এনপিকে ১৯:১৯:১৯ সারে নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম সমান পরিমাণে থাকে। নাইট্রোজেন গাছকে সবুজ রাখে, ফসফরাস শিকড় ও ফুল আনে এবং পটাশিয়াম ফলন বাড়াতে ও রোগ প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।
ব্যবহারের নিয়ম: ১ লিটার জলে ৫ গ্রাম (এক চামচ) এনপিকে ১৯:১৯:১৯ সার মিশিয়ে নিন। এটি গাছের গোড়ায় দেওয়ার পাশাপাশি স্প্রেও করতে পারেন। ২০-২৫ দিন অন্তর একবার বিকেলে এটি প্রয়োগ করুন। মনে রাখবেন, চড়া রোদে কোনও সার স্প্রে করবেন না।
সমাধান ৩: ৩জি কাটিং (3G Cutting) ও প্রুনিং – ফলন ৩ গুণ বাড়ানোর ট্রিক
আপনার লঙ্কা গাছটি কি শুধুই লম্বা হচ্ছে, কিন্তু ডালপালা কম? তবে আপনি খুব বেশি লঙ্কা পাবেন না। এর সমাধান হলো ‘ডগা ছাঁটাই’ বা প্রুনিং। গাছ যখন ৮-১০ ইঞ্চি লম্বা হবে বা গাছে ৫-৬ জোড়া পাতা আসবে, তখন একদম উপরের কচি ডগাটি নখ দিয়ে বা কাঁচি দিয়ে আধা ইঞ্চি কেটে দিন। ডগা কাটার ফলে গাছের অক্সিন হরমোন নিচের দিকে চলে আসে এবং চারপাশ থেকে নতুন নতুন ডাল বের হয়। যত বেশি ডাল হবে, তত বেশি ফুল ও ফল আসবে। একেই অনেকে ‘থ্রি-জি কাটিং’ বলেন।
ঘরোয়া সমাধান- একটি জাদু তরল
লঙ্কা গাছের ফুল ঝরে যাওয়া রুখতে রাসায়নিক সার তো প্রয়োগ করাই যায়, তবে যারা পুরোপুরি ঘরোয়া সমাধান চাইছেন, তাদের বানাতে হবে এই জাদু তরল। প্রথমেই ২ লিটার জলে ২০০ গ্রাম মতো ডিমের খোসার গুঁড়ো নিতে হবে, তারপরে দিতে হবে কলার খোসা আর অল্প ১০০ গ্রাম গুড় আর ৫০ গ্রাম ব্যবহৃত চায়ের পাতা। এই মিশ্রণটি টানা ১০ দিন রেখে দিতে হবে। তারপর ছেঁকে নিয়ে, ১০ লিটার জলে এই মিশ্রণটি ঢেলে মিশিয়ে গাছে দেবেন অল্প করে- প্রতি সপ্তাহে একবার। গাছ ভরে লঙ্কা আসবে, বাজারে যাওয়ার কথাই ভুলে যাবেন।
মাটি তৈরিতে নজর দিন
লঙ্কা গাছ যারা টবে চাষ করছেন, তাদের জন্য মাটি তৈরি করা খুব জরুরি বিষয়। টবে লঙ্কা চাষের জন্য মাটি ঝুরঝুরে হওয়া দরকার। তাতে জল যেন জমে না থাকে। মাটি তৈরির অনুপাত এরকম- ৪০ শতাংশ বাগানের মাটি, ৪০ শতাংশ কম্পোস্ট বা গোবর সার, ৩০ শতাংশ বালি। এতে গাছে ফলন ভাল হবে, দ্রুত ফুল ধরবে। মনে রাখতে হবে, লঙ্কা গাছে যখন ফুল আসতে শুরু করবে, সেই সময় টবে গাছের গোড়ার দিক কিছুটা ছেড়ে একটা নালার মত করতে হবে এবং মাটি খানিক উপর-নীচ করে দিতে হবে যাতে বায়ু চলাচল ভাল হয়। আর ওই নালার মত জায়গায় আপনি সার দিতে পারেন, জল গোড়ায় না দিয়ে ওই নালাতেই দিতে হবে।
৫টি গোল্ডেন টিপস
ইউটিউব ভিডিওগুলিতে অনেক সময় ছোট ছোট গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হয়। আপনার জন্য রইল বাড়তি কিছু টিপস:
১. হালকা ঝাঁকুনি (Hand Pollination): প্রতিদিন সকালে লঙ্কা গাছের ডালগুলি হালকা করে ঝাঁকিয়ে দিন। এতে পরাগায়ন ভালো হয় এবং ফুল থেকে ফল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। আপনি চাইলে লঙ্কার ফুলগুলির লালচে গর্ভমুণ্ডটাও আলতো হাতে নাড়িয়ে দিতে পারেন। একেই বলে হ্যান্ড পলিনেশন।
২. জলের পরিমাপ: ফুল আসার পর থেকে মাটি শুধু ভিজে (Moist) রাখুন, কাদা করবেন না। কাদা করলে ফুল দ্রুত হলুদ হয়ে ঝরে যায়।
৩. বোরন স্প্রে: যদি দেখেন গাছের কচি পাতা কোঁকড়া হয়ে যাচ্ছে এবং ফুল ঝরছে, তবে ১ লিটার জলে ১ গ্রাম বোরন মিশিয়ে মাসে একবার স্প্রে করুন।
৪. রোদের গুরুত্ব: লঙ্কা গাছকে অন্তত ৫-৬ ঘণ্টা কড়া রোদে রাখুন। ছায়ায় রাখলে গাছ শুধু লম্বা হবে, লঙ্কা হবে না।
৫. জৈব কীটনাশক: মিলিবাগ বা মাকড় ঠেকাতে প্রতি ১০ দিনে একবার নিম তেল স্প্রে করুন।
লঙ্কা গাছের ওষুধ
১) পরাগায়ন সহায়ক: বাজার থেকে মিরাকুলান (Miraculan) বা সুপার সোনাটা (Super Sonata) এই ধরনের পিজিআর কিনে এনে এক লিটার জলে মাত্র ২ মিলিগ্রাম মিশিয়ে সন্ধ্যার দিকে লঙ্কা গাছে স্প্রে করতে পারেন। গাছে ফুল আসার পরেই এই কাজ করা যায়, এর আগে নয়। এতে গাছ ভরে ফুল আসবে।
২) পিঁপড়ে রোধক: লঙ্কা গাছে অনেক সময় পিঁপড়ের উপদ্রব দেখা যায় যা গাছের ফুল নষ্ট করে দেয়। লঙ্কা গাছে পিঁপড়ের যম হল একটি ঘরোয়া তরল। এক লিটার জলে প্রথমে অ্যালোভেরা পাতার জেল খানিকটা (এক চা চামচ) মিশিয়ে নিন। এরপরে লেবুর রস নিন একই পরিমাণে। যে কোনও বাসন ধোয়ার তরল সাবান একই পরিমাণে মিশিয়ে নিন। এই তরল গাছে স্প্রে করলে পোকা দমন হবে।
৩) পটাশ: পটাশিয়ামের ঘাটতির কারণে লঙ্কা গাথে ফুল ঝরে যায়, ফলন আসে না। এই সমস্যা দূর করতে আপনাকে দিতে হবে পটাশ (মিউরেট অফ পটাশ)। এক চা চামচ পটাশ গাছের গোড়া থেকে খানিক দূরে ছড়িয়ে দিতে হবে। মাসে একবার এই সার দিতে হবে।
আপনি যদি বাগান করতে ভালোবাসেন এবং নিয়মিত নতুন টিপস, গাছের যত্নের সহজ উপায় ও ছাদবাগানের অভিজ্ঞতা জানতে চান, তাহলে বং গার্ডেনের কমিউনিটিতে যোগ দিন। আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হলে সরাসরি গার্ডেনিং টিপস, সমস্যা সমাধান ও নতুন পোস্টের আপডেট পাবেন। আর ফেসবুক পেজে থাকলে প্রতিদিন বাগান সম্পর্কিত ছবি ও দরকারি তথ্য দেখতে পারবেন। লিঙ্কে ক্লিক করে এখনই Bong Garden পরিবারের অংশ হয়ে যান।
চটজলদি সমাধান
১. লঙ্কা গাছে ফুল ঝরে যাওয়ার প্রধান কারণ কী?
লঙ্কা গাছে ফুল ঝরে যাওয়ার কারণ হল পুষ্টির অভাব, বিশেষ করে বোরনের ঘাটতি, অনিয়মিত জল দেওয়া এবং অতিরিক্ত তাপমাত্রা। অনেক সময় মাটি খুব বেশি ভিজে থাকলেও গাছ স্ট্রেসে চলে যায় এবং ফুল ধরে রাখতে পারে না। আবার মাটি একদম শুকিয়ে গেলেও একই সমস্যা হয়। তাই সঠিক জল ব্যবস্থাপনা ও সুষম সার ব্যবহার করলে ফুল ঝরে যাওয়া অনেকটাই কমানো যায়।
২. লঙ্কা গাছে কোন সার দিলে ফুল ও ফল বেশি হয়?
লঙ্কা গাছে ফুল ও ফল বাড়াতে সুষম সার খুব গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত NPK ১৯:১৯:১৯ সার ব্যবহার করলে গাছ নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম সমানভাবে পায়। এতে গাছের বৃদ্ধি ভাল হয়, ফুল বেশি আসে এবং ফলনও বাড়ে। পাশাপাশি মাঝে মাঝে জৈব কম্পোস্ট বা গোবর সার দিলে মাটির উর্বরতা বজায় থাকে।
৩. টবে লঙ্কা চাষ করলে কতটা রোদ দরকার?
লঙ্কা গাছ সুস্থভাবে বাড়তে হলে প্রতিদিন অন্তত ৫–৬ ঘণ্টা সরাসরি রোদ দরকার। পর্যাপ্ত রোদ না পেলে গাছ লম্বা হয়ে গেলেও ফুল ও ফল কম ধরে। তাই ছাদ বা বারান্দার এমন জায়গায় টব রাখুন যেখানে দিনের বেশিরভাগ সময় সূর্যের আলো আসে এবং গাছ পর্যাপ্ত তাপ ও আলো পায়।
৪. লঙ্কা গাছে ফুল এলেও ফল ধরছে না কেন?
অনেক সময় লঙ্কা গাছের ফুল ঝরে যাওয়ার কারণ হলো ঠিকভাবে পরাগায়ন না হওয়া। পরাগায়ন ব্যাহত হলে ফুল থেকে ফল তৈরি হয় না এবং ফুল অকালেই ঝরে পড়ে। অতিরিক্ত গরম, আর্দ্রতার অভাব বা পোকামাকড়ের আক্রমণ থাকলেও এই সমস্যা দেখা যায়। তাই এই ধরনের অবস্থায় সকালে গাছকে হালকা ঝাঁকুনি দিলে বা হাতে পরাগায়ন করলে লঙ্কা গাছের ফুল থেকে ফল ধরার সম্ভাবনা অনেকটাই বেড়ে যায়।
৫. ঘরোয়া উপায়ে লঙ্কা গাছের ফলন বাড়ানো যায় কি?
হ্যাঁ, কয়েকটি সহজ ঘরোয়া উপায়ে লঙ্কা গাছের ফলন বাড়ানো যায়। যেমন ডিমের খোসা, কলার খোসা ও গুড় দিয়ে তৈরি জৈব তরল সার গাছে দিলে মাটিতে পুষ্টি বাড়ে। এছাড়া নিয়মিত নিম তেল স্প্রে করলে পোকামাকড়ের আক্রমণ কমে এবং গাছ সুস্থ থাকে। এতে গাছে বেশি ফুল ও ফল আসে এবং গাছ দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠতে সাহায্য পায়।